ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনুবাদ সাহিত্যের প্রভাব

আতাউর রহমান খসরু:  মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নে অনুবাদ সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষত বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নয়নে অনুবাদ সাহিত্য চালকের ভূমিকা পালন করেছে। সংরক্ষিত ইতিহাসের সূচনাকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে অনুবাদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। উমাইয়া যুগে শুরু হওয়া এবং আব্বাসীয় যুগে পূর্ণতা পাওয়া মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানগত জাগরণের সময় মুসলিম মনীষীরা গ্রিক, সিরীয়, ফার্সি ও মিসরীয় ভাষায় রচিত বহু গ্রন্থ অনুবাদ করেন, যা ইসলামী বিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের সূচনা করেছিল।

শুধু মুসলিম বিশ্বে নয়; বরং ইউরোপের জ্ঞানচর্চাকেও অনুবাদ সাহিত্য প্রভাবিত করেছে। মধ্যযুগের বেশির ভাগ সময় এবং আধুনিক যুগের প্রথমাংশে ইউরোপজুড়ে ল্যাটিনই ছিল জ্ঞানচর্চার সাধারণ ভাষা এবং একমাত্র ল্যাটিন ভাষা যার মাধ্যমে চিকিৎসা শাস্ত্র শেখানো হয়েছে, বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং গ্রন্থ রচিত হয়েছে। দীর্ঘ অনুবাদ প্রচেষ্টার পর চিকিৎসা বিজ্ঞান জার্মান, ফ্রান্স, ইংরেজি ও রুশ ভাষায় ব্যবহার উপযোগী হয়েছে। এমনকি ১৯ ও ২০ শতক পর্যন্ত অনুবাদ এসব আঞ্চলিক ভাষায় জ্ঞানবিস্তারে ভূমিকা রেখেছে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উন্নয়নে সহযোগিতা করেছে। একবিংশ শতকের শুরুর ভাগে ইংরেজি বিজ্ঞানের বাহক ভাষায় পরিণত হয় এবং তা প্রাচীনকালের গ্রিক ও মধ্যযুগের ল্যাটিন ভাষার মতোই অবদান রাখতে আরম্ভ করে।

‘গ্রিক-আরবি অনুবাদ আন্দোলনের’ ফলে মধ্যযুগেও আরবি বিজ্ঞানের সাধারণ ভাষায় পরিণত হয়েছিল। স্পেনের গুয়াডালকুইভির ও ভারতের গঙ্গা নদীর তীরে চিকিৎসকরা আরবি ভাষায় চিকিৎকসা-বিজ্ঞানের বই লিখেছেন। এমনকি আধুনিক ইউরোপের সূচনাকালেও আরবিকে বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ ভাষাগুলোর একটি মনে করা হতো। এ জন্য ফ্রান্সিসকান ফ্রিয়ার রজার বেকন আরবি ভাষা শেখার পক্ষে ছিলেন। বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ জন সেলডন বলেন, “মুক্ত ও যথাযথভাবে বিজ্ঞানচর্চাকে আমরা দীর্ঘকাল ধরে ‘দ্য স্টাডিজ অব আরবস’ বা ‘অ্যারাবিক স্টাডিজ’ বলতাম। ” দিমিত্রি গুটাস যিনি আরবি ও গ্রিক ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং গ্রিক-আরবি অনুবাদ আন্দোলন বিষয়ে সবিস্তার অধ্যয়ন করেছেন তিনি বলেছেন, ‘গুরুত্ব ও প্রভাবের বিচারে এটি (গ্রিক-আরবি অনুবাদ আন্দোলন) ক্লাসিক্যাল এথেন্স বা ইতালি রেনেসাঁর সমতুল্য। ’

গ্রিক-আরবি ভাষা আন্দোলন বলতে বোঝায় আব্বাসীয় আমলে গ্রিক ভাষায় রচিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখার বইগুলো আরবি ভাষায় ভাষান্তর করা। অষ্টম শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে দশম শতকের প্রথমাংশ পর্যন্ত প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ায় পঠিত ও পাঠ্য ছিল এমন সব গ্রন্থ আরবি ভাষায় অনূদিত হয়। গ্রিক দর্শন ছাড়া আরো বহু বিষয় তাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। যেমন দর্শন বিষয়ে অ্যারিস্টটল, প্লেটো, প্লুটিনাস ও পোরফাইরি, গণিতে ইউক্লিড, জ্যোতিষ ও মহাকাশ বিজ্ঞানে টলেমি, চিকিৎসা শাস্ত্রে হিপোক্রেটস ও গ্যালেন, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে হিরো অব আলেকজান্দ্রিয়ার রচনাবলি অনূদিত হয়। এ ছাড়া কিছু জনপ্রিয় নীতি-নৈতিকতা যেমন নমোলোজিক্যাল কালেকশন ও সাহিত্য যেমন দ্য আলেকজান্দ্রার রোমান্স, মেনান্ডার অন লাইনারও ভাষান্তরিত হয়।

গ্রিক-আরবি অনুবাদ আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল বায়তুল হিকমাহ, যা একটি অনুবাদকেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও ক্রমেই তা উচ্চতর গবেষণাকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মানমন্দিরে পরিণত হয়। আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ বাগদাদে তা প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা আবু জাফর মানসুর গ্রিক জ্ঞান ও দর্শনের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তাঁর নির্দেশে চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রকৌশল ও সাহিত্যের বইগুলো অনুবাদ করা হয়। খলিফা মামুন বায়তুল হিকমাহকে পূর্ণতা দান করেন। তিনি রোম, পারস্য ও ভারতবর্ষ থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সাহিত্যের দুর্লভ বই সংগ্রহ করে তার অনুবাদ ও তার ভিত্তিতে গবেষণার নির্দেশ দেন। খলিফা মামুন নিজেও বায়তুল হিকমার দৈনন্দিন কাজে অংশ নিতেন। তার আমলে বায়তুল হিকমায় জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, চিকিৎসা ও সাহিত্যের ওপর অসংখ্য বই অনূদিত ও রচিত হয়। তাঁর যুগকেই বায়তুল হিকমাহর স্বর্ণযুগ বলা হয়।

বায়তুল হিকমাহর কার্যক্রমে কয়েক ভাগে বিভক্ত ছিল। যেমন : ১. অনুবাদকেন্দ্র। বিভিন্ন ভাষা থেকে বইসমূহকে আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হতো। ২. পাঠাগার। সংগৃহীত, অনূদিত ও রচিত বইসমূহ সংরক্ষণ ছিল তার মূল কাজ, ৩. মাদরাসা। শিক্ষার্থীদের পাঠদান, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও বিতর্কের আয়োজন, গবেষণা কাজ পরিচালনার দায়িত্ব ছিল মাদরাসার, ৪. মানমন্দির। জ্যোতির্বিদ্যার ওপর উচ্চ গবেষণার জন্য এটি নির্মাণ করা হয়।

ঐতিহাসিকরা গ্রিক-আরবি অনুবাদ আন্দোলনকে তিন ভাগে ভাগ করেন। তা হলো—ক. সূচনাকাল তথা অষ্টম শতকের শেষ ভাগ—যে সময় পর্যন্ত কৌশলগত পরিভাষা ও শব্দ ভাণ্ডার গড়ে ওঠেনি।

খ. উৎকর্ষকাল তথা নবম শতকের মধ্যভাগ—যখন অনুবাদ আন্দোলন সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল।

গ. পতনের কাল তথা দশম শতাব্দীর প্রথমভাগের পরবর্তী সময়।

অনুবাদ আন্দোলনের স্বর্ণযুগ তথা দ্বিতীয় যুগে ‘আরব দার্শনিক’ খ্যাত আল কিন্দি এবং হুনাইন ইবনে ইসহাককে কেন্দ্র করে দুটি পৃথক ধারা গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে বাগদাদে গ্রিক দর্শনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন আল ফারাবি। এ ছাড়া আবদুল্লাহ ইবনে বাতরাক ও আবদুল্লাহ ইবনে মুকাফফাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুবাদক মনে করা হয়।

মানবসভ্যতার প্রথম অনুবাদ আন্দোলনের ফলে মুসলিম বিশ্বে জ্ঞানচর্চায় প্রচলিত ধারায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মুসলিম ধর্মীয় জ্ঞানের বাইরে জাগতিক জ্ঞানচর্চার দুয়ার উন্মোচিত হয়। এ ক্ষেত্রে গ্রিক দর্শনের প্রভাব ছিল সবচেয়ে প্রবল। গবেষকদের দাবি, যদিও ভারতীয় ও পারসিক দর্শনও অনূদিত হয়েছিল, তবু বলতে হবে গ্রিক দর্শনই ইসলামী সভ্যতার উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। গ্রিক মতবাদই ছিল আরব জনজীবনে সবচেয়ে কার্যকর বিদেশি প্রভাব।

গ্রিক প্রভাবের ভালো-মন্দ দুটি দিকই আছে। কেননা একদিকে গ্রিক দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে মুসলিম মনীষী ও পণ্ডিতরা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিত্য-নতুন বিষয়ে গবেষণা করেছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর সব গ্রন্থ রচনা করেছেন। অন্যদিকে গ্রিক দর্শনের প্রভাবে একদল মানুষ ঐশী জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে এবং অন্যান্য মতবাদের মতো ইসলামী আকিদা, বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের নানা বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে; বরং তারা ঐশী জ্ঞানের ওপর মানব রচিত মতবাদকে প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে মুসলিম বিশ্বে বহু ভ্রান্ত মতবাদের জন্ম হয়েছে।

তথ্যঋণ : বই : পাশ্চাত্য সভ্যতার উৎস; প্রবন্ধ : দ্য ইনফ্লুয়েন্স অব গ্রিক ইন ইসলামিক সায়েন্টিফিক ট্রেডিশন, ট্রান্সলেশন মুভমেন্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published.